Racism v. Colorism বা সাদা মানে “উন্নত” বনাম সাদা মানে “সুন্দর”

June 4, 2020

#BlackLivesMatter আন্দোলনের প্রেক্ষিতে অনেক বাংলাদেশি ব্যক্তি এতে সংহতি জানানোর পাশাপাশি আমাদের সমাজে বিদ্যমান কালো গায়ের রঙ এর প্রতি যে প্রেজুডিস বা বাজে সংস্কার আছে তার কথা বলছেন। অনেকেই বলছেন যে যারা আমেরিকার কৃষ্ণাংদের সমর্থন করে কিন্তু গায়ের রঙ কালো হোলে দেশী মানুষদের নিয়ে টিতকারী মারে, তারা নিজেরাও রেসিস্ট।

আপাতভাবে এই মনোভাব প্রশংসার দাবী রাখে, কারণ এর ফলে আমাদের সমাজে বিদ্যমান এবং লালিত stigma, prejudice, discrimination উঠে আসছে। racism এর বাংলা হল বর্ণবৈষম্য, আবার color এর বাংলা প্রতিশব্দ হল বর্ণ । তাই বর্ণবৈষম্যের সাথে ফর্সা গায়ের রঙের প্রতি মোহ গুলিয়ে ফেলা সহজ।

তথাপি, আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গরা যে বৈষম্যের শিকার তার সাথে আমাদের দেশে গায়ের কালো রঙ মিলিয়ে ফেলা ভুল।
যেহেতু অনেকেই বর্ণবৈষম্য নিয়ে সোচ্চার হচ্ছেন, তাই তাত্ত্বিক ভাবে রেসিজম এর ধারণা পরিষ্কার হওয়া আবশ্যক বলে মনে করি। এ জন্যই এ লেখা।

রেসিজম মানে prejudice / discrimination against someone of a different race based on the belief that one’s own race is superior. আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তিরা কেবল কালো হওয়ার জন্য বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন না। রেসিজম এর প্রধান কারণ হল জাতি হিসেবে একটি গোষ্ঠীকে হেয় করা। আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গরা আফ্রিকা মহাদেশ থেকে আমেরিকায় এসেছিলেন দাস হিসেবে। ঔপনিবেশিক আমলে শ্বেতাঙ্গ সেটলারেরা প্রথমে আমেরিকার আদিবাসীদের অর্থাৎ আমেরিকান ইন্ডিয়ানদের হটিয়ে তাদের ভূমি দখল করল। অতঃপর আফ্রিকা মহাদেশ থেকে কালো চামড়ার মানুষদের অপহরণ করে নিয়ে আসল। এক্ষেত্রে শ্বেতাঙ্গরা লক্ষ্য করল, আফ্রিকা ভূখন্ডে যারা থাকে, তারা ‘আমাদের মত’ না। তারা কেবল দেখতে কালো তাই না, এদের চোখ-মুখের গড়ন, দেহকাঠামো সবই আলাদা। এরা আমাদের মত না। এরা আলাদা জাতি। এখানে জাতি বলতে nation and race দুটাই বোঝানো হচ্ছে। যেহেতু কৃষ্ণাঙ্গরা আলাদা জাতি, তারা আলাদা। এখানে একটি Other-ing করা হল। Other-ing এর ফলে dehumanizing হল। অর্থাৎ, এরা দেখতে মানুষের মত হলেও, এরা ঠিক আমাদের মত পূর্ণ মানুষ না। পূর্ণ মানুষ নয় বলে, এদের সাথে মানুষের মত ব্যবহার করার দরকার নেই।
এভাবে সাদারা আফ্রিকার কালো মানুষদের ওপর অমানবিক ব্যবহারকে জাস্টিফাই করে। আফ্রিকা মহাদেশের মানুষদের কেবল দাস হিসেবে অপহরণ করেই আনা হয় নি, তাদের personal property এবং chattel হিসেবে দেখা হত। এই ঘটনা ঘটেছে সেই দেশে, যেখানে ১৭৭৬ সালে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছিল যে সব মানুষ সমান, তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। পরে আব্রাহাম লিঙ্কন দাসপ্রথা বিলুপ্ত করলেও কৃষ্ণাঙ্গরা এই ধারণা পুরা ভাংতে পারেনি।
কাজেই, আমেরিকায় Black Lives Matter এজন্য না যা তাদের গায়ের রঙ কালো, বরং এ জন্য যে কৃষ্ণাঙ্গদের আসলে ‘অন্য চোখে’ দেখা হয়। এখানে নৃতাত্ত্বিক বিষয়টাও আসছে- মনে করা হয় যে আফ্রিকা ভূখন্ড থেকে যারা এসেছিল, তারা হল নিগ্রয়েড, যারা আসলে সাদাদের (ককেশীয়দের) চাইতে নিচু জাতি। এর সাথে অনেক হিসেব করে তারা, আফ্রিকার পূর্বপুরুষ থেকে আসা এই কালোদের ডিএনএ তাদের চেয়ে খারাপ,
এই জে “জাতি’ হিসেবে দেখা, এটাই রেসিজম। এমন রেসিজম আমেরিকায় যেমন কালোদের সাথে হয়, অন্য নৃতাত্ত্বিক জাতির সাথেও হয়, যেমন ল্যাতিনো, আমেরিকান ইন্ডিয়ান প্রভৃতি। অনেক সাদা আমেরিকান এখনও এদের proper আমেরিকান মনে করে না। এরা সবাই lesser American, lesser human.
এখন দেখা যাক আমাদের সমাজের কালো মানুষের সাথে পার্থক্য কোথায়। আমাদের দেশে গায়ের রঙ কালো হলে আমরা তাদের পছন্দ করি না, কারণ আমরা সাদা চামড়ার সাথে ‘ভালো ও সুন্দর’ কে যুক্ত করি। যারা দেখতে শ্যামলা বা কালো, তাদের আমরা ‘অন্য’ মনে করি না। অর্থাৎ, ধরুন আপনি বাঙালি। আপনি গায়ের রঙ কালো এমন পাত্র/পাত্রী বিয়ে করবেন না। মানে, আপ্রার কাছে কালো মানে ‘অসুন্দর”, খারাপ না ! এটা না যে গায়ের রঙ কালো বলে আপনি একজনকে আর বাঙালি/ বাংলাদেশি-ই মনে করবেন না। এটা হল colorism / discrimination on the basis of skin color.
আমাদের দেশে রেসিজম হয় যখন আমরা কোন মানুষকে একটি জাতি বা গোষ্ঠীর সাথে তুলনা করি নিচু/ খারাপ দেখানোর জন্যঃ
– সকল আদিবাসীকে (পাহাড়ী কি সমতল) চোখ বন্ধ করে চাইনিজ বলা
– তুই তো ‘নিগ্রোদের’ মত কালো বলা
– তুই একটা ‘রোহিঙ্গা’ বলা
– কোন বাঙ্গালির চোখ ছোট হলে তাঁকে ‘চাকমা’ বলা
প্রশ্ন উঠে যে আমাদের এই ফর্সা রঙের আসক্তি কীভাবে হল। মজার ব্যাপার, এটা সরাসরি না হলেও প্রচ্ছন্নভাবে রেসিজম আছে।
প্রাক ঔপনিবেশিক যুগে কালো গায়ের রঙ উপমহাদেশে কিন্তু অপছন্দের ছিল না। নিষাদ, দ্রাবিড় এ সকল জাতি ছিল কালো। বেদ-পুর্ব যুগের অনেক দেবী কালো, যেমন মনসা। সকল কালো খারাপ ছিল না। কালো রাবণ রাক্ষস হয়ে যান ত্বকের জন্য না বরং তার জাতির জন্য, আবার রামের ত্বক ছিল কালো, সীতারও। কালী দেবী কালো, বিষ্ণুর অবতার কৃষ্ণ-ও কালো।
আর্যরা যখন দ্রাবিড়দের পরাজিত করে, তখন ধীরে ধীরে কিছুটা ফর্সা রঙের অগ্রাধিকার শুরু হয়। উপযুক্ত কন্যা হলেন যার গায়ের রঙ দুধে-আলতা। মনুসংহিতায় এমন অনেক বিবরণ পাওয়া যাবে। আর্যদের মধ্যে ব্রাহ্মণ্যবাদ ছিল, যেখান থেকে বর্ণবাদ (castism) শুরু হয়। বিজেতা আরিয়ান ব্রাহ্মণেরা বিজিত কালো দ্রাবিড়িয়ানদের বিয়ে করতে খুব একটা ইচ্ছুক ছিল না, তাদের ঠেলে নিচু জাত বানানো হল। ৪টি বর্ণের যে ধারণা, ব্রাহ্মণ- ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শূদ্র, শুরুতে তা শিথিল ছিল, জন্মসূত্রে না বরং পেশাসূত্রে জাত ঠিক হত, পরবর্তীতে তা কঠোর হয়ে যায়, এবং আমরা দেখি জাতপাতের প্রভাব। এর মধ্যে আফঘান, পারসীয়, আরব এমন বহু ইন্দো-ইউরোপিয় জাতি আসল। তারা ভারতীয়দের চাইতে ফর্সা, তারা শাসক। তার ফর্সা মানে “অভিজাত” এটা শুরু হল। এ মনোভাব চূড়ান্ত রূপ নেয় বৃটিশ আমলে।
বৃটিশেরা ঠিক তাদের আমেরিকান পূর্বপুরুষদের মত দেখল, ভারতের মানুষেরা ‘আলাদা’। এরা কেমন সেলাই ছাড়া কাপড় পরে, কীসব খায়, কেমন করে নাচে, যন্ত্রপাতি নাই। তারা আমাদের ধীরে ধীরে বোঝালো, সাদা চামড়া সাহেবরা “উন্নত”, সাদা সাহেব্দের মত হলে জীবনে বড় হওয়া যায়। এটাই colonialism, যেখানে বিজয়ী জাতি এসে বিজিতদের বোঝায়, তোমাদের পুরো জাতি আমাদের চেয়ে নিচু। সেই মন্ত্র আমাদের মাথায় গেঁথে গেল, আর আমরা ফর্সা মানুষের সাথে নিজেদের মিলিয়ে ভারী আনন্দ পেতে লাগলাম। এভাবেই বৃটিশদের রেসিজম আমাদের ভেতর ঢুকল। বৃটিশ্রা চলে যাবার পর, আমরা নিজেদের জাতের ভিত্তিতে বড়-ছোট করলাম না, খালি গায়ের রঙের সাথে আভিজাত্য, সৌন্দর্য, সম্মান এগুলোকে টানতে থাকলাম। সেটাই আজ চলছে।
তাই #BlackLivesMatter এর সাথে আমাদের সমাজের ফর্সা রঙের প্রতি মোহ সম্পূর্ণ গুলিয়ে ফেলা ঠিক না।
হ্যাঁ, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বাঙ্গালিরা আলাদাভাবে রেসিজম এর শিকার হয়েছে। পাক হানাদার বাহিনি যখন বলে বাঙালি মেয়েদের গায়ের গন্ধ ভালো- সেটা রেসিজম ছিল। ইয়াহিয়া যখন বলেছে, এদেশের মাটি চাই মানুষ না, সেটা রেসিজম। পাকিস্থানি ঔপনিবেশিক শোষক যখন বলেছে বাঙ্গালিরা inferior race, বাংলা একটা অপবিত্র ভাষা, সেটা রেসিজম। এখানে কিন্তু সাদা কালো দেখা হয় নাই।

আমরা যেন অতি সরলিকরণ না করি।

4 thoughts on “Racism v. Colorism বা সাদা মানে “উন্নত” বনাম সাদা মানে “সুন্দর””

Leave a Comment

Your email address will not be published.