(c)New Indian Express

‘Moral Policing: আইনের বাইরে যে শাসন’

(c)New Indian Express
(c)New Indian Express

first published: Taramon, May 2019

এ বছর পহেলা বৈশাখে কতৃপক্ষ হঠাত নির্দেশ দিল যে, বিবাহিত দম্পতি ব্যতীত কোন যুগল (মানে যুবক-যুবতী) একত্রে বাইকে চড়তে পারবেন না। এখন বিবাহিত বাইকের মালিকেরা তাঁদের ম্যারেজ সার্টিফিকেট নিয়ে বের হবেন কিনা তা একটা বড় প্রশ্ন। পহেলা বৈশাখে এমনিতেই যে ভীড়, তাতে এত গুরুত্বপূর্ণ দলিল হারানোর চিন্তাতেই তো আনন্দ মাটি। তা ছাড়া ঢাকা শহরে যত বাইক, সবাইকে ধরে ধরে কাগজ চেক করতে গিয়ে পহেলা বৈশাখের বিখ্যাত ভীড় আর কত বাড়তে পারে, সেটাও একটা বৈধ চিন্তা। তবে, সব ছাপিয়ে আমার চিন্তা হল, এই নির্দেশনাটা কি বৈধ?

সেই সূত্রে আরেকটি ঘটনা মনে পড়ে। আমার এক পরিচিতাকে তাঁর পাশের বাসার মুরুব্বি বলেছেন যে, সে প্রতি রাতেই দেরি করে অফিস থেকে ফেরে, এটা নাকি খারাপ। আজকাল গাউসিয়া মার্কেটে প্রায়ই নারী ক্রেতাদের দোকানদারেরা ধরে পেটাচ্ছেন, নারীরা নাকি বেশি কথা বলে দোকানদারকে বিরক্ত করে।

এই যে এ তিনটা ঘটনা, সবগুলো ক্ষেত্রে মিল কি? মিল হল, প্রতি ক্ষেত্রেই কোন রকম এখতিয়ার ছাড়াই মানুষজন নারীকে শাসন করার দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন। কেন নিয়েছেন? কারণ তাঁদের মতে, এ নারীরা সঠিক আচরণ করছে না, কাজেই তাদের পথে আনা দরকার। এমন ঘটনাকে পোশাকি ভাষায় বলা হয় মোরাল পোলিসিং।

মোরাল পোলিসিং মানে হল কেউ যখন তাঁর নিজস্ব নৈতিকতা, ভুল-ঠিক, ভাল-খারাপের ধারণা আরেকজনের উপর চাপাতে চায় এবং সে জন্য ওপর ব্যক্তির স্বাধীনতা প্রয়োগে বাধা দেয়। অর্থাৎ যেহেতু ঐ মুরুব্বির ধারণা সন্ধ্যার পর মেয়েদের ঘরের বাইরে থাকা উচিত না, তাই তিনি তার প্রতিবেশির কাছে গিয়ে কেন তিনি সুর্য ডোবার পরেও বাইরে আছেন এজন্য কথা শোনান। এটাই মোরাল পলিসিং।

এখন ঘটনা হচ্ছে, আমাদের সামাজিক আচারে মুরুব্বিরা প্রায়ই আমাদের অনেক উপদেশ দিয়ে থাকেন, সেটি আর মোরল পোলিসিং মিলিয়ে ফেলা যাবে না। দুটোর মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে, একটিতে অপরের কল্যাণের জন্য স্নেহ থেকে কথা বলা হয়, আর মোরাল পোলিসিং এর ক্ষেত্রে যাকে উপদেশ দেয়া হচ্ছে তাঁকে প্রথমেই খারাপ বলে ধরা হয়। এবং তাঁদের সঠিক পথে আনার জন্য নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়। যেমন, পহেলা বৈশাখে যদি অবিবাহিতদের বাইকে চড়তে মানা করা হয়, তা এজন্য নয় যে আমরা বাইকার দের ভালমন্দ নিয়ে চিন্তিত, তা এজন্য যে কিছু মানুষ ধরে নিয়েছে যে, অবিবাহিতরা বাইকে চড়লেই সেটা খারাপ কাজ হবে। কিন্তু আইনে এমন কিছুই বলা নেই। ঐ ব্যক্তিদের ধারণা, বাংলাদেশের সমাজ বা সংস্কৃতি অনুযায়ী অবিবাহিতদের গা ঘেঁষে বসা খারাপ। এজন্য যদি নজরদারি শুরু হয়  সেটা মরাল পলিসিং এবং অনেক ক্ষেত্রে তা আইন বহির্ভুত।

মোরাল পলিসিং আইনের প্রয়োগ না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই  স্থানীয়ভাবে বা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতাশালী ব্যক্তিরা (পড়ুন পুরুষেরা) তাঁদের কর্তৃত্বের অপব্যবহার করে মোরাল পলিসিং করে থাকেন। যখন মনে করা হয় যে আইনের মাধ্যমে মেয়েদের নিয়ন্ত্রনে রাখা যাচ্ছে না, বা সমাজে দেশিয় আচার টিকে থাকছে না, কিন্তু এখানে আইনের মাধ্যমে কোন পদক্ষেপ নেয়া যাবে না তখন মানুষ নিজের হাতে আইন তুলে নেয়।

বাংলাদেশ ভারত পাকিস্তান, অর্থাৎ আমাদের উপমহাদেশে মেয়েদের শাসন করার একটি প্রবণতা আছে। নারীরা তাদের অধিকার আদায়ে কোন কাজ করতে গেলেই বলা হয় যে তারা নির্লজ্জ, বা অভদ্র। খারাপ মেয়ে শব্দটা আমরা প্রায়ই শুনি। সমাজের একটি অংশ আছে যারা মনে করেন মেয়েদের শাসনে না রাখলে সমাজ নষ্ট হয়ে যায়। এমন মানুষেরাই বিভিন্ন সময়ে মোরাল পলিসিং করে।

চিন্তার বিষয় হচ্ছে, আজকাল  আইন শৃংখলা বাহিনীও এমন করে থাকেন। যেমন ধরুন, রাতের বেলা একজন নারী ছিনতাই এর শিকার হল। পুলিশ তখন ছিনতাইকারীকে ধাওয়া না করে যদি উল্টো প্রশ্ন করেন যে , আপনি একা একা রাতের বেলা কেন রিকশায় উঠেছেন? বা আপনার সাথে কোন পুরুষ নেই কেন? গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে বগুড়াতে কিছু রেস্টুরেন্টে পুলিশ রেড করে ৪০জন স্কুল কলেজের শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ যে তাঁরা ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। তাঁদের গালিগালাজ করা হয়, তাঁদের ছবি স্থানীয় পত্রিকায় ও সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রকাশ করা হয় এবং তারপর তাদের মা, বাবার কাছে তুলে দেয়া হয়। স্কুল পালালে সে খবর মা, বাবা-কে দেবে স্কুল কর্তৃপক্ষ। তাঁরা কেন পুলিশকে এর মধ্যে জড়ালো? কেনইবা পুলিশ তাদের গ্রেফতার করল? ক্লাস ফাঁকি দেয়া বাংলাদেশের কোন আইনেই অপরাধ নয়!

মোরাল পলিসিং-এর সবচেয়ে বড় কুফল হল এর মাধ্যমে মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতার হস্তক্ষেপ করা হয়, এবং নারীদের ক্ষেত্রে এই হস্তক্ষেপের মাত্রা আর বেশি। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, নারীর নিরাপত্তার অজুহাতে, অশ্লীলতা বন্ধের কথা বলে, নারীর স্বাধীনতাকে খর্ব করা হয়। মোরাল পলিসিং এর আর বড় একটি নিদর্শন আমরা সম্প্রতি দেখেছি। বাংলাদেশের একটি মফস্বল শহরে দুজন যুবক যুবতীকে একসাথে বসে গল্প করছিলেন, তখন স্থানীয়রা এসে তাদের পাশের একটি জঙ্গলে নিয়ে যায়, এবং তাদের বিবস্ত্র করে নির্যাতন করে। এই সাহস তারা কথায় পেল? এই সাহস তাঁরা পেল একারণে যে তাঁরা গভীরভাবে বিশ্বাস করত যে অবিবাহিত ছেলে মেয়ে একসাথে বসে গল্প করা খারাপ, ছেলে মেয়ে একসাথে থাকা মানেই তাঁরা অশ্লীল কাজ করছে। এসব ঘটনায় তরুণদের চলাফেরার স্বাধীনতা, গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন হয়েছে, তাঁদের সম্মানহানী হয়েছে। তাঁরা কিরকম মানসিক আঘাত পেয়েছেন সেটাও ভাবতে হবে।

আমাদের দেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউটিউব ব্লক করা থাকে এই যুক্তিতে যে, শিক্ষার্থীরা যেন কৌশলে  কোন সেক্সুয়াল কন্টেন্ট দেখতে না পারে। একটি প্রতিষ্ঠান ঠিক করে দিচ্ছে যে শিক্ষার্থীরা অনলাইনে কী করবে আর কী করবে না। এর ফলে তথ্য পাবার যে মৌলিক অধিকার, তা লঙ্ঘিত হচ্ছে। একের পর এক ওয়েবসাইট ব্লক হয়ে যাচ্ছে যেন পর্ণোগ্রাফি রোধ করা যায়। কিন্তু গবেষণা বলে, এভাবে পর্ণোগ্রাফি থামানো সম্ভব না। ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের এক শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল এ মর্মে যে তিনি পাঠদানের সময় অশ্লীল ছবি দেখিয়েছেন। যে ছবিগুলো তিনি দেখিয়েছেন, পরে পরীক্ষা করে জানা যায় যে সেগুলো অশ্লীল ছবি নয়, বরং যৌন নির্যাতন বোঝার জন্য সেগুলো শিক্ষণীয় উপকরণ ছিল। এই হল আমাদের দেশে মোরাল পলিসিং এর ভয়াবহ দিক। বিশ্ববিদ্যালয়ের মত স্থানেও এখন মোরাল পোলিসিং হয়। টিএসসিতে একসাথে বসে থাকা যুগলদের যখন তখন ধমকি দেয়া তো নিয়মে পরিণত হয়েছে।  আমাদের দেশে বিভিন্ন নারী হস্টেলে সূর্যাস্ত আইন নামে একটি অলিখিত প্রথা আছে, যেখানে মেয়েদের সন্ধ্যার মধ্যে রুমে ফিরতে হয়। কেউ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে দেরি করে ফিরলে নানারকম জবাবদিহিতা করতে হয়। এটি ব্যক্তি স্বাধীনতার লঙ্ঘন। মার্চ মাসের শেষ দিকে আমি ফেসবুকে দেখি যে একটি গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে নাকি বলা হয়েছে মেয়েদের স্কার্ফ পরে ক্লাসে যেতে হবে।

এই যে অনুশাসন, এটা কিন্তু সাংবিধানিকিভাবে অবৈধ। আমাদের সংবিধান কী বলে?

সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে সবার সমান অধিকারের কথা বলা আছে। ২৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে যেকোন পাবলিক প্লেসে বা সরকারি প্রতিষ্ঠানে নারী পুরুষ সমান প্রবেশ অধিকার পাবেন। ৩৬ অনুচ্ছেদে চলাফেরার স্বাধীনতা দেয়া আছে, ৩৭ অনুচ্ছেদে সভা/সমিতি/সংগঠনের অধিকার, ৪৩ অনুচ্ছেদে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার, ৩৯ অনুচ্ছেদে ব্যক্তিগত ধর্মবিশ্বাসের অধিকার দেয়া আছে। যেখানে সংবিধান আমাদের এই অধিকার দিচ্ছে, তখন সমাজের কিছু অংশ, এবং তাঁদের প্রভাবে স্থানীয় প্রশাসন বা স্থানীয় ক্ষমতাবান ব্যক্তিরা আমাদের অধিকার ভোগে বাধা দিচ্ছেন, কারণ তাঁদের ‘নিজস্ব’ নীতি অনুযায়ী, তরুণীদের, নারীদের এত স্বাধীনতা ঠিক না।

এই যে মোরাল পোলিসিং, এটি আসলে অপরাধ। বিভিন্নভাবে এটি ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। যেমন, আমাদের পেনাল কোড অনুযায়ী, অকারণে গ্রেফতার অপরাধ। ব্যক্তির ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে আইনশৃংখলা বাহিনি কর্তৃক আইন অমান্য,অন্যায়ভাবে ভীতিপ্রদর্শন, নারীর মর্যাদাহানি করা, অবৈধভাবে আটকে রাখা, সম্মানহানীর উদ্দেশ্যে আঘাত করা, চাঁদাবাজি, যৌন নিগ্রহ ; মোরাল পলিসিং এর মাধ্যমে যখন এগুলো করা হয়, এর প্রতিটি-ই বাংলাদেশের আইনে অপরাধ, এবং যারা মোরাল পোলিসিং করে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে ব্যবস্থা নেয়া উচিত।

5 thoughts on “‘Moral Policing: আইনের বাইরে যে শাসন’”

  1. ব্যক্তি স্বাধীনতায় অযাচিত ও ক্ষতির উদ্দেশ্যে হস্তক্ষেপকে অন্যায় বলা যেতে পারে। তবে সেটা যদি আদতেই ক্ষতির উদ্দেশ্যে না করা হয়ে থাকে (যেমনটা বগুড়ায় ছাত্রদের ক্ষেত্রে পুলিশ করেছে) সেক্ষেত্রে এই বিষয়টি মোরাল পলিসিং অন্তর্ভুক্ত হয় কি? কেননা, ছাত্ররা তাদের দায়বদ্ধতা থেকে সরে এসেছে এবং এই ক্ষেত্রে স্কুল কর্তৃপক্ষের অক্ষমতার কারণে পুলিশ তাদের এক প্রকার সাহায্য করেছে, যা পুলিশ বাহিনীকে প্রায়ই করতে হয়।

  2. En estos casos el mecanismo peneano de la rigidez es normal, pero la erección se ve dificultada por problemas psicológicos que pueden deberse a ansiedad de ejecución (miedo a no conseguir una erección, miedo a fallar), problemas de pareja, depresión u otros problemas psicológicos.

Leave a Comment

Your email address will not be published.