ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার, আইনের ব্যাখ্যা এবং আমাদের ধারণা

ধরুন, ‘ক’ একজন নারী। তিনি একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে আছেন। শিক্ষার্থী হিসেবে না কর্মজীবী হিসেবে, সেটি খুব একটা জরুরী না। ‘খ’ একই প্রতিষ্ঠানে একজন পুরুষ। ক-এর প্রতি তাঁর আগ্রহ আছে। নিজের পছন্দের কথা জানানোর জন্য তিনি ক-কে প্রাইভেট মেসেজ পাঠান। এসকল ক্ষুদে বার্তায় তিনি নানারকম আলাপ করেন, যা ‘ক’ স্বাচ্ছন্দ্যে গ্রহণ করেন না। ক পরিষ্কারভাবে জানান যে তিনি কোন সম্পর্কে জড়াতে আগ্রহী নন। এরপর-ও খ তাঁর আলাপ চালিয়ে যেতে থাকেন, এবং একসময় অতিষ্ঠ হয়ে ক ওই প্রতিষ্ঠানের অন্যদের সাহায্য নেন। প্রতিষ্ঠানের ওই দলটি খ-কে দলগতভাবে বর্জন করেন, তাঁর উত্যক্তকারী আচরণের মুখোশ উন্মোচন করেন, এবং কেবল তাই-ই না, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘খ এর (উত্যক্তকারী) বার্তাগুলোর স্ক্রিনশট গুলো প্রকাশ করেন। এর ফলে খ কেবল তাঁর প্রতিষ্ঠান নয়, বৃহত্তর সমাজেও অত্যন্ত হেয়প্রতিপন্ন হন। খ এতে সংক্ষুব্ধ বোধ করেন, এবং যেহেতু ‘প্রাইভেট মেসেজ’ পাবলিক ফোরামে শেয়ার হয়েছে, এই মর্মে তিনি নিজেকে সাইবার অপরাধের শিকার মনে করেন। তিনি বলেন যে, তিনি মানহানির পাশাপাশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘনের জন্য মামলা দায়ের করবেন। তাঁর সাথে সহমত হয়ে অনেকেই উত্যক্ত হওয়া নারী‘ক কে মামলার ভয় দেখিয়েছেন এবং বলেছেন, প্রাইভেসি অধিকারের সাথে কম্প্রমাইজ করা যাবে না।

প্রশ্ন হল, এই ধারণার সঠিক আইনগত ব্যাখ্যা কী?

আইন সম্পর্কে প্রচলিত ধারণা থেকে আমরা অনেক সময় এমন অনেক কিছু ভাবি, যা আসলে আইনি কাঠামোতে ভুল। এ ভুলগুলোর জন্য দায়ী অনেক সময় আইনের অপব্যাখ্যা, অনেক সময় আইনের অপপ্রয়োগ এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এগুলো আইন সম্পর্কে জানার অভাব থেকে। কারো কিছু স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করে দিলে তাতে মানহানি হয় কিনা বা ভুক্তভোগী পুরুষ এতে মামলা করতে পারেন কিনা, বিষয়টা অত সাদামাটা না।মানহানি মানে আসলে কি? অপমান হলেই বা কাউকে খারাপ দেখালেই মানহানি হয় না। আইন মোতাবেক মানহানি হওয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে শর্ত তা হল যেসব কথা প্রচার হচ্ছে, তা মিথ্যা হতে হবে। অর্থাৎ, ফেসবুকে প্রকাশিত স্ক্রিনশট যদি মিথ্যা বানোয়াট না হয়ে থাকে, প্রকাশিত স্ক্রিনশট যদি ওই পুরুষের বিরুদ্ধে করা অভিযোগের প্রতি দিক-নির্দেশ করে ( খ উত্যক্ত করেছেন এবং এই স্ক্রিনশটে তা বুঝা যাচ্ছে), তাহলে তা প্রচলিত আইন অনুযায়ী মানহানি নয়। দ্বিতীয়ত, যেসব তথ্য “অপমানজনক” বলা হচ্ছে, সেসব তথ্য কি কোন অপরাধ্মূলক কার্যক্রম? প্রকাশিত স্ক্রিনশট ওই ব্যক্তিকে ক্ষুব্ধ করতে পারে, কিন্তু ওই স্ক্রিনশট এ যেসব তথ্য দেখা যাচ্ছে, সেগুলো কি কোন অপরাধের চিহ্ন বহন করে? যদি এর উত্তর হ্যাঁ হয়, তাহলে মানহানি তো দূরে থাক, বরং ওই স্ক্রিনশটের ওপর ভিত্তি করে ফৌজদারী আইন অনুযায়ী খ-এর বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে এমনকী আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাও স্বপ্রণোদিত হয়ে আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে। অর্থাৎ, এসব স্ক্রিনশটের ভিত্তিতে অভিযুক্ত খ-এর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা যেতে পারে।

কেন?

কারণ, অপরাধ করে থাকলে “প্রাইভেসি” বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আর কোন ডিফেন্স হিসেবে কাজ করে না। যে পুরুষ বলেন যে, (উত্যক্তকারী) বার্তা প্রকাশ করে দেয়ায় তাঁর গোপনীয়তার অধিকার লংঘিত হচ্ছে, এটি আসলে খোড়া যুক্তি। যেমন ধরুন, কেউ তাঁর নিজের বেডরুমের ভেতর বসে মাদক নিল। (অপরাধবিজ্ঞানের ভাষায় এটা Victimless Crime, কারণ এখানে অপরাধী অন্য কারো ক্ষতি করছেন না)। বেডরুম একটা প্রাইভেট স্পেস হলেও এই মাদকসেবন করা কোন ব্যক্তিস্বাধীনতা নয়। বরং মাদক সেবন যেকোন স্থানেই (বাংলাদেশের আইনে) অপরাধ। এই অপরাধ নিয়ে উন্মুক্ত ভাবে কথা বললেও অভিযুক্ত ব্যক্তির/অপরাধীর ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লংঘিত হয় না।

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আসলে কী?

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা মানে যে বিষয়গুলো একান্তই আপনার নিজের, এবং যে বিষয়গুলো আইনের সাথে সাংঘর্ষিক না, সে সম্পর্কে অন্যায্য হস্তক্ষেপ করা যাবে না। কিন্তু আপনি একান্তে আইন ভাঙ্গলে তা আর গোপনীয়তা পাবে না। যেমন, কেউ যদি একান্তে নিজের ক্ষতির প্রয়াস করেন, তখন আর প্রাইভেসি খাটবে না, যে ভাই আমি প্রাইভেটলি আমার নিজের ক্ষতি করব অন্যেরা কেন হস্তক্ষেপ করবে? অন্যেরা হস্তক্ষেপ করবেন কারণ এতে ওই ব্যক্তির নিজের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি, জীবনের ক্ষতি এমন নানাবিধ ক্ষতি হবে। এতে সামগ্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রের-ও ক্ষতি হবে। এসকল কারণে এসকল কাজে প্রাইভেসি ডিফেন্স আইন অনুমোদন করবে না।এর মানে দাঁড়ালো যে, গোপনীয়তার দোহাই দিয়ে আপনি গোপনে গোপনে অপরাধ করতে পারবেন না। বরং অপরাধ করলে তা ফাঁস করে দেয়া বৈধ হবে, এবং আইন চাইলে ফাঁসকৃত তথ্যের ভিত্তিতে আপনাকে অভিযুক্ত হিসেবে গণ্য করবে। অতঃপর, সেই অভিযোগ প্রমাণ হলে আপনি অপরাধী হবেন। হ্যাঁ, এটুকু অধিকার আইন আপনাকে অবশ্যি দেবে, যে প্রথমেই আপনাকে অপরাধীর তকমা লাগাবে না। আপনি প্রথমে অভিযুক্ত ব্যক্তি, এবং প্রমাণসাপেক্ষে অপরাধী।

২০০৬ সালের সাইবার অপরাধ আইনের বিধি মোতাবেক আপনার বিরুদ্ধে পুলিশের সাইবার সেল মামলা দায়ের করতে পারেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ এর অধীনেও একে কোনভাবেই ফেলা যাবে না, কারণ ওই আইনে বলা আছে যে ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে অপরাধ করলে তা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সুরক্ষা পাবে না।ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারা মোতাবেকঃ যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে, ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে, এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যাহা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক … কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয় প্রতিপন্ন করিবার অভিপ্রায়ে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন… তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।

কাজেই আমরা যখন লাফ দিয়ে আইনের একটা ব্যাখ্যা দিয়ে দেই, আমাদের একটু ভেবে চিনতে তা করা উচিত। আইন সমাজের বাইরে না। আজও বাংলাদেশে অনেকেই আছেন যারা ভাবেন ধর্ষণ না হলে, বা গায়ে হাত না দিলে যৌন নিগ্রহ নিয়ে বেশি আলাপ করার দরকার নাই। ওটা “কোন ব্যাপার না”। এই সমাজে আইনের ব্যাখ্যা ভুল হওয়া বিচিত্র না। কিন্তু, আইন যেন ক্ষমতার কাছে হেরে না যায়, সেজন্য আইন সম্পর্কে ঠিক ধারণা রাখা জরুরি।তাহলে কি ‘খ’ মামলা করতে পারবেন না? পারবেন!দেখুন, মামলা করা একটি আইনি অধিকার, কেবল তাই না বরং বলা যায় এটি সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত একটি মৌলিক অধিকার। আপনি যদি সংক্ষুব্ধ বোধ করেন, অবশ্যি মামলা করবেন। কিন্তু আপনার মামলার “মেরিট” আছে কিনা, সেটা কিন্তু আলাদা প্রশ্ন। আপনি মামলা করুন, কিন্তু মামলার জোরালো আইনি ভিত্তি না থাকলে সে মামলা খারিজ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু, ক্ষমতার বলয় ব্যবহার করে যদি আপনি রাষ্ট্রীয় আইন ব্যবহার করতে চান, সেটা আইনের অপব্যবহার। আইনের অপব্যবহার করলেও ( frivolous and vexatious case) কিন্তু তা অপরাধ এবং এতে দণ্ড হতে পারে।

সুতরাং, কেবল নিজের অধিকার না, আমাদের আইনি কর্তব্য সম্পর্কেও সচেতন হতে হবে। আইনকে আমরা যেন সঠিকভাবে জানি, সঠিক ব্যাখ্যা করি।

4 thoughts on “ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার, আইনের ব্যাখ্যা এবং আমাদের ধারণা”

Leave a Comment

Your email address will not be published.