পুলিশের কেস ডাইরিঃ ঔপনিবেশিক আইনের এক আশ্চর্য উদ্ভাবন

আমাদের উপমহাদেশীয় আইন ব্যবস্থায়, যা কিনা বৃটিশ উপনিবেশের অবদান, পুলিশ এবং তাঁর কেস ডাইরি এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে রয়েছে। অপরাধের অনুসন্ধান, তদন্ত, এবং সাক্ষ্য প্রমাণসহ আদালতে  তা উপস্থাপনের ক্ষেত্রে  পুলিশ এবং তাঁর কেস ডাইরি বিশেষ ভূমিকা রাখে। এমন বললে অত্যুক্তি হবে না যে পুলিশের কেস ডাইরিতে অসামঞ্জস্য থাকলে তা মামলার মেরিট বা সত্তাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। কেস ডাইরিকে পুলিশি তদন্তের খুঁটি হিসেবে দেখানো হয়, পড়ানো হয়। কিন্তু এই কেস ডাইরি যে আসলে ঔপনিবেশিক মানসিকতার জ্বলজ্বলে নিদর্শন , তা কি যথেষ্ঠ আলোচিত হয়?

আমাদের এখানে যে ফৌজদারী কার্যবিধি প্রচলিত, সেখানে পুলিশকে নির্বাহী বিভাগের মুখপাত্র হিসেবে তদন্তের ভারবাহী করা হয়েছে। খেয়াল করার বিষয় এই যে, ১৮০০ শতকে যখন কোম্পানি রাজত্বে ফৌজদারী ক্রিয়াকলাপ এবং বিচারের বিষয়গুলো সাজানো হচ্ছিল, তখন খোদ কোম্পানির নিজ দেশ ইংল্যান্ডে পুলিশকে তদন্তের ভার দেয়া অনুচিত ভাবা হত। সে আমলে ইংল্যান্ডে মামলার তদন্ত, সাক্ষ্য প্রমাণ যোগাড় এ কাজের দায় নিতে হত মামলার বাদীকে, অর্থাৎ কোন আইনি পেশাদার মানুষ না বরং ব্যক্তিগতভাবে ভুক্তভোগীই সব সাজিয়ে গুছিয়ে বিচারকের দরবারে উপ্সথাপন করবেন, এটাই ছিল কমন ল’এর বিধি। কেবল তাই নয়, বৃটিশ পূর্ববর্তী বিভিন্ন আইন ব্যবস্থায় (বৈদিক, সুলতানী এবং মুঘল আইন ব্যবস্থা) তদন্তকারী কোন আলাদা কর্তৃপক্ষ ছিল না।  মুঘল আইন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক নন্দিনী চট্টোপাধ্যায়ের গবেষণা থেকে জানা যায়, সে আমলে ভুক্তভোগী/ বাদী ব্যক্তি নিযে উপযাচক হয়ে মামলা পরিচালনা করতেন। উকিল নামক যে পেশা তা ছিল খুব বিশেষায়িত কেসের জন্য। নতুবা কোতয়ালরা মূলত কাজির দরবারে কোর্ট অফিসার এর ভূমিকা পালন করত।  এ অভিযোগ দায়ের ও মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে ‘মাহযারনামা’ নামক এক ফরম্যাট ব্যবহৃত হত, যা কিনা ক্লাসিকাল শরিয়া পিরিয়ডের (১০-১২ শতক) মাহজার এর অনুকরণে প্রস্তুত করা হত। 

 কিন্তু উপমহাদেশে সেই কমন ল প্রচলন করতে এসে বৃটিশ রাজের হর্তাকর্তারা ঠিক করলেন যে এখানে আলাদা কোন বাহিনীকে তদন্ত করে দিতে হবে। প্রশ্ন হল, কেন?

এই ভাবনার পেছনে মূলত দায়ী ছিল উপমহাদেশের নেটিভ অর্থাৎ দেশি মানুষদের সম্পর্কে বিদ্বেষ ও কুসংস্কার। নেটিভরা ধূর্ত, কপট, মিথ্যাবাদী এবং প্রতারক- এই ভাবনা থেকে বৃটিশরা ঠিক করল যে কোন নিরপেক্ষ ব্যক্তি অর্থাৎ অভিযোগের সাথে জড়িত না এমন মানুষকে সব খুঁজে বের করতে দিলে কোন মিথ্যা চলবে না।  

সে ধারণার মুর্তিমান রূপ হল বৃটিশ আমলের বিখ্যাত দারোগাবাবু। বংগের এই দারোগারা কুখ্যাত ছিলেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, দারোগা নামক পদ মুঘল আমলে থাকলেও বৃটিশ দারোগার সাথে তাঁর কাজের কোন মিল ছিল না। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ যদুনাথ সরকারের কাজ থেকে জানা যায় যে, মুঘল আমলে দারোগারা ছিলেন তদারকী ভূমিকাতে, তাঁর কোন পুলিশি বা তদন্তের ক্ষমতা ছিল না। সেই দারোগা থেকে বৃটিশ দারোগারা হয়ে গেলেন বিশেষ এক প্রজাতি যাদের কাজ ছিল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সাক্ষ্য প্রমাণ হাজির করা। 

আপাতভাবে খুব ভালো মনে হলেও এখানে কিছু সমস্যা ছিল। শুরু থেকেই দারোগাদের বিরুদ্ধে বলপূর্বক/ মারপিট করে স্বীকারোক্তি আদায়, নিজের পক্ষপাত্মূলক দৃষ্টিভংগি থেকে তদন্তের ঘটনাপ্রবাহ বিবৃত করা, যা হয়েছিল তার চাইতে যা হলে দারোগাবাবুর মনপসন্দ হবে সেভাবে রিপোর্ট লেখা, প্রমাণ তৈরি করা (ফ্যাব্রিকেশন অফ এভিডেন্স), মিথ্যা সাক্ষী বানান এমন নানা অভিযোগ পাওয়া যায়। তাছাড়া, উচ্চবর্ণের হিন্দুরা সাধারণত এ চাকুরিতে যেত না বলে দারোগাকে ছোট জাতের চাকুরি ধরা হত। দারোগার ক্ষমতা ছিল, প্রতিপত্তিও ছিল, কিন্তু ছিল না সামাজিক প্রভাব বা অবস্থান।  ১৮৩৮ এর পুলিশ কমিটি রিপোর্এটের এসব অভিযোগ বৃটিশ সরকারের ধারণা বদ্ধমূল করে যে নেটিভরা আসলেই খারাপ জাত। 

কাজেই আজকে যখন পুলিশি তদন্ত , সুরতহাল রিপোর্ট, মিথ্যা সাক্ষী এমন কথা শোনা যায়, তাঁর একটা সুদীর্ঘ ঔপনিবেশিক উতস আছে। আমাদের পুলিশি সংস্কৃতি  এবং তাঁর সাথে লাগোয়া দুর্নাম হঠাত এমন হয় নি। 

কিন্তু মজা এখানেই। বি-উপনিবেশিকরণ বা ডিকলনাইজেশণ এর একটা মুল স্তম্ভ হল এপিস্টেমলজি বা জ্ঞানের সূত্রকেও বি-উপনিবেশায়ন করতে হবে। বৃটিশ আমলের বিভিন্ন প্রতিবেদন আসলে কলোনিয়াল লেন্স থেকে দেখা ও লেখা। কাজেই ওই প্রতিবেদনে নেটিভ দৃষ্টিভংগী কখনই যথার্থভাবে প্রস্ফূটিত হয় নি।  এর পাশাপাশি যা বলা হয় না, তা হল, দারোগারা এমন কাজ করতে বাধ্য ছিলেন। যদিও কমন ল’এর একটি জরুরি নীতি হল ক্ষমতার বিভাজন বা সেপারেশন অফ পাওার, বৃটিশ ভারতে ম্যাজিস্ট্রেট আসলে দারোগার উপর ছড়ি ঘুরাতেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ম্যাজিস্ট্রেট থাকতেন স্থানীয় থানা থেকে বহুদূরে শহরে, আর স্থানীয় মামলায় দ্রুত সময়ে তদন্ত শেষ করতে না পারলে চাইলেই দারোগার চাকুরি খেতে  পারতেন ম্যাজিস্ট্রেট।  ১৮৫৮ সালের এক কমিটি অনুসন্ধানে বঙ্গের ম্যাজিস্ট্রেট রিড সাহেব বয়ান দিয়েছিলেন যে ম্যাজিস্ট্রেটের দয়ায় চাকুরি বাচানোর জন্যই দারোগারা চাপে পড়ে জোর করে স্বীকারোক্তি আদায় শুরু করেছিল।  এসকল অনুসন্ধানের পর কোম্পানি শাসকেরা  দারোগাদের ক্ষমতার অপব্যবহারের দায় চাপিয়ে দেয় জাতিগত প্রবণতা বা রেশিয়াল প্রপেন্সিটির ওপর, অর্থাৎ নেটিভ লোকেরা ঠিকমত কাজ করতে পারে না। 

এসব রিপোর্রট প্রকাশের ফলে বিলাতে হইচই পড়ে যায়। তখন আইন কমিশন গঠন করে পুরী ফৌজদারী কার্যব্যবস্থা ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব হয়। সেই প্রস্তাব বড় বিতর্ক হয়ে উঠে কে তদন্ত করবে আর কে বিচার করবে সেই প্রসন্নগ। ম্যাজিস্ট্রেটের সরাসরি তদারকিতে দারোগাকে রাখা যাচ্ছিল না, আবার দারোগাকে সম্পূর্ণ একক ক্ষমতাও দেয়া যাচ্ছিল না। খুটিনাটি দেখে বুঝা যায় যে পুলিশ আর ম্যাজিস্ট্রেটকে সম্পূর্ণ আলাদা রাখা যাচ্ছে না। শেষমেশ এক অভূতপূর্ব সমঝোতা করা হয়। বলা হয়, তদন্ত করবে দারোগা, কিন্তু সেই তদন্ত এডমিসিবল/ গ্রহণযোগ্য কিনা তা দেখবে ম্যাজিস্ট্রেট। সাক্ষ্য প্রমান যগাড় করবে দারোগা, কিন্তু সেই সাক্ষ্য প্রমাণ আদালতে ব্যবহার হবে কিনা তা ঠিক করবে ম্যাজিস্ট্রেট। এবং পুলিশ কখনই লিখিত কোন প্রমাণ দাখিল করতে পারবে না। 

তবে, দারোগা তাঁর কাজ ঠিকমত করছে কিনা, তাু তো দেখতে হবে। এবং সেই তাড়ণা থেকেই পুলিশের উপর দায়িত্রব দেয়া হল, তদন্তেয় প্রতি ধাপের সব খুঁটিনাটি লিখে রাহতে হবে যেন চাহিবামাত্র ম্যাজিস্ট্রেট দেখতে পারেন পুলিশ কবে কখন কোথায় কার সাথে কি করেছে। এই লিখিত বিবরণই আমরা কেস ডাইরি হিসেবে চিনি।

অর্থাৎ, এই কেস ডাইরি আসলে তদন্ত বা ন্যায় বিচার নিশ্চত নয়, বরং উপনিবেশিক ম্যাজিস্ট্রেটেত সামনে নেটিচ দারোগার অক্ষমতার বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে এক ঔপনিবেশিক ছাল ছাড়া কিছুই ছিল না।, ঔপনিবেশিক শাসনের মূল লক্ষ্য থাকে ক্ষমতার মাধ্যমে শাসিতকে দমন। তাই স্বাধীন আইনি ব্যবস্থায় যখন এই ঔপনিবেশিক ব্যবস্থা থেকে যায়, সেই কেস দাইরি ক্রমাগত ঔপনিবেশিক উপায়ে অর্থাৎ দুর্বলের বিপক্ষে ক্ষমতাবানের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে। এই ক্ষমতাবান আজ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক, ধর্মীয় এমন নানা পরিচয় ধারণ করে বিরাজ করে।

references:

1. Sir jadunath Sarker, Mughal Administration (1935)

2. Nandini Chatterjee, Negotiating Mughal Law (2020)

3. 18th Report of the Committee formed by Lord Auckland in 1838 to investigate the state of the Bengal Police  1838

4. Buckland, Police Torture and Murder in Bengal: Reports of Two Trials of the Police of the District of Burdwan, 1859

Leave a Comment

Your email address will not be published.