গ্রামবাংলার মানুষ, মহামারী, আর সেকাল-একালের চালচিত্র

LIFE stock image
সন্ধ্যাবেলায় বসে শরৎচন্দ্রের ‘পণ্ডিতমশাই’ পড়ছিলাম। সে গল্পে দোলের পর পর, অর্থাৎ বছরের ঠিক এ সময়টাতেই গ্রামে ওলাওঠা শুরু হয়। এক জন ভেদবমি করে মারা যায়, তারপর আস্তে আস্তে এক সপ্তাহের মধ্যে কয়েক পাড়া মিলে গ্রামে মহামারী শুরু হয়। মহামারির চিত্রটা খুব পরিচিত মনে হল।
বৃন্দাবন, এ গল্পের নায়কের যে পাঠশালা, সেটা বন্ধ হয়ে গিয়েছে। গরিব মানুষ ফিস দিয়ে ডাক্ডাতার আনতে পারছে না, ঘরে বসে থাকছে। শরচ লিখছেনঃ ‘ যাদের পালাবার জায়গা ছিল, তাহারা পলাইয়া বাঁচিল, অধিকাংশেরি ছিল না, তাহারা ভীত সুষ্বাক মুখে সাহিস তানিয়া কহিল, অন্ন-জল ফুরাইলেই যাইতে হইবে, পলাইয়া কি করিব?”
এই ওলা ওঠার একটা বড় কারণ ছিল, ঐ গ্রামের সকল পুকুর আর ডোবার পানি ছিল মজা। আর গ্রামের মানুষ ভাবত, জলে যতক্ষণ ধোয়া আর রাঁধা যায়, জল ঠিক আছে। জলের আবার ভালোমন্দ কী?
ঐ গ্রামে কেবলমাত্র নায়ক বৃন্দাবনের পাড়ায় রোগ আসে নি, কারণ বৃন্দাবন তার পুকুরটিকে শুদ্ধ রেখেছিল। কিন্তু, তার পারারি তারক বামুনের ছোট ছেলে কলেরায় মারা গেলে পর ঐ বামুন জাতের দোহাই দিয়ে মৃত রোগির পোশাক পোড়াতে অস্বিকার করল, এবং সেই সাথে বৃন্দাবনের পুকুরে সেই কলেরা রোগীর পোশাক ধোয়া শুরু করল।
লেখাপড়া জানা বৃন্দাবন এর জর প্রতিবাদ জানিয়ে বলে দিল, পুকুরের পানিতে সব করা যাবে, কিন্তু কলেরা রোগীর পোশাক অতে ধোয়া যাবে না। তারক বামুন গালিগালাজ করে ক্ষান্ত দিলে না, সেই দুপুর থেকে ধীরে ধীরে পাড়ার অন্যান্য বামুনেরা এসে বৃন্দাবনকে গালি দিল। বৃন্দাবনের কথা ততক্ষণে পালটে ‘কাপড় ধোবেননা থেকে শতরূপ পেয়েছেে- সে পারার লোককে পুকুরে নামতে দিচ্ছে না, সে মেয়েদের বেপর্দা করার জন্য পুকুর আগলে রেখেছে, জল তোলা বন্ধ করে মানুষকে শেষ করে দিচ্ছে ইত্যাদি। গ্রামের লোকেদের এক কথাঃ দু পাতা ইংরেজি পড়ে বৃন্দাবন যেন নিজেকে দিগগজ না ভাবে। শাস্ত্রমতে প্রতিষ্ঠিত পুকুরের জল কখনই অশুদ্ধ হয় না, তাতে কলেরা রোগীর পোশাক ধুলেও কিছু যায় আসে না। বৃন্দাবন বুঝিয়ে বুঝিয়ে ক্লান্ত, পরে সে দারোয়ান বসায় যেন পুকুরে কেউ কাপড় না ধোয়।
রাতে এসে দারোয়ান খবর দেয়, তারক দলবল নিয়ে এসে বৌকে দিয়ে পোশাক ধোয়াচ্ছে, আর দারোয়ান বেচারা একা কিছু করতে না পেরে চলে এসেছে।
শরতবাবুর এ গল্প ১৯শ শতকের। আজ ২০২০ এর সন্ধ্যায় বসে আমি এ গল্প পড়ছি। ১৮০০র ঐ মহামারির সাথে ২০০০এর অতিমারীর কত মিল, সে যুগের গ্রামবাংলার মানুষের সাথে আজকের গ্রামবাংলার মানুষের কত মিল, সে যুগের ধর্মান্ধ অহংকারি মানুষের সাথে আজকের মানুষের কত মিল। নিয়ম না মানা, কুকথা রটানো, শিক্ষিত লোককে কেবল জাতপাত বা অর্থের কারণে গুরুত্বহীন মনে করা, বিজ্ঞান আর ধররীয় বিদ্যার মধ্যে তুলনা টানা – এর সবটাই তো আমি আজ দেখতে পাচ্ছি!
তাই ভাবলাম, এই দুশো বছরে আদৌ কি আমরা এগিয়েছি?
তাছাড়া, অন্তত এ কথা তো পরিষ্কার, যে যতটা বা যেধরণের এগুনর গর্বই আমরা করি না কেন, তাতে গ্রামবাংলার মানুষের অংশগ্রহণ নেই। তাদের পেছনে ফেলে যদি অন্য একটা অংশের মানুষ এগিয়েও থাকে, দেশ কি তাতে এগোয়? সমাজের বড় অংশকে পেছনে রাখলে তো এগিয়ে যাওয়া অংশ আর সমাজ থাকে না, তারা হয়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন একটি গোষ্ঠী।
গোষ্ঠীর উন্নয়ন করতে গিয়ে তাহলে দেশকে আমরা কোথায় ফেলে এলাম, সে প্রশ্ন করা বধহয় আজ অপরাধ না। অপ্রাসঙ্গিক তো একদমই না।
image credit: LIFE 

2 thoughts on “গ্রামবাংলার মানুষ, মহামারী, আর সেকাল-একালের চালচিত্র”

  1. A question in your write up (i.e., তাই ভাবলাম, এই দুশো বছরে আদৌ কি আমরা এগিয়েছি?) can be stretched up as research question for a peer-reviewed article! That’s an intellectual benefit of sifting through your write ups.
    My opinion may stand at odds with the perceptions of others. However, as side note, regarding pandemics of 18th century and contemporary time, what perhaps most conspicuously absent in South Asia, is the ‘pro-active participation’ of civil society.
    Anyway, if the author or readers of this write up find any multi-disciplinary research literature (i.e., articles/books/monographs), please enlighten us.
    Thank you author for such thoughtful but simple write up.

  2. গত দু’শো বছরে প্রযুক্তিগত উন্নতি হয়েছে বটে, তবে বিজ্ঞানের প্রতি বাংলার মানুষের অ্যাটিচ্যুড খুব একটা পাল্টেছে বলে মনে হয় না। অামার কাছে মনে হয় এর পেছনে কাজ করে নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবা। অামি যা বলি, তাই ঠিক – বলা মানুষগুলোর ভিন্নমত গ্রহণ না করার প্রবণতা এর জন্য দায়ী। দুর্ভাগ্যক্রমে এ ধরণের মানুষের সংখ্যাই বেশি। যে সমাধান ইতোমধ্যে অামাদের কাছে অাছে, তা গ্রহণ না করার জন্য অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হওয়া সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার।

Leave a Comment

Your email address will not be published.