করোনা, অনলাইন শিক্ষা এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য

করোনাকালীন ২৬ মার্চ থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রী বলছেন প্রায় ৪ কোটির মত শিক্ষার্থীর শিক্ষা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তবে প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকলেই লেখাপড়া যেন সম্পূর্ণ বন্ধ না থাকে, এই লক্ষ্যে নানারকম পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হল টিভি এবং অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষাদান কর্মসূচি। শিক্ষা মানবাধিকারের মধ্যে অন্যতম, এবং বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার। এর অর্থ হচ্ছে, প্রতি শিক্ষার্থী যেন শিক্ষা লাভের সমান সুযোগ লাভ করে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিততে শিক্ষার্থীরা সমান সুযোগ পাচ্ছে না, বরং তাদের পারস্পরিক অভাব ও দুর্বলতা লাফিয়ে চোখের সামনে চলে আসছে। এর ফলে খুব স্পষ্টভাবে আমরা শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্যগুলি দেখতে পাচ্ছি।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের দিক থেকে, শিক্ষার অধিকারের ৪টি দিক আছে, একে বলা হয় 4 A-s:
  1. Availability: শিক্ষার সুযোগ, মানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং উপকরণ সহজলভ্য হতে হবে
  2.  Physical as well as Economical Accessibility: শারীরিক ও অর্থনোইতিকভাবে আমার নাগালের মধ্যে থাকবে। এ বিষয়ে জাতিসঙ্ঘের অর্থনোইতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ক কমিটির জেনারেল কমেন্ট ১৩ র চুম্বক অংশ তুলে দিচ্ছিঃ
Economic accessibility – education has to be affordable to all. This dimension of accessibility is subject to the differential wording of article 13 (2) in relation to primary, secondary and higher education: whereas primary education shall be available “free to all”, States parties are required to progressively introduce free secondary and higher education;they also have an obligation to take concrete steps towards achieving free secondary and higher education
      3. Acceptability ঃ যেভাবে শিক্ষা দেয়া হচ্ছে তা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে হবে।
      4. Adaptability ঃ সময়ের ও সমাজের প্রয়োজনে এটি সুপরিবর্তনশীল হতে হবে।
 
এ ৪টি শর্ত কেবল থাকলেই হবে না, সবার ক্ষেত্রে তা সমানভাবে থাকতে হবে, অর্থাৎ আমি ইন্টারনেট পাচ্ছি এবং আমার হাতে স্মার্টফোন আছে, আর আপনার কাছে খালি স্মার্টফোন আছে কিন্তু ইন্টারনেট সংযোগ খুব খারাপ বা নেই, তাহলে বলা যাবে না যে আপনি আর আমি শিক্ষার সমান সুযোগ পাচ্ছি। ক্যাপাসিটি বা সক্ষমতা এখানে অনেক বড় একটি বিষয়। কমিটির বক্তব্য অনুযায়ী, উচ্চ শিক্ষার সাথে প্রাথমিক শিক্কজার মূল পার্থক্য হল, প্রাথমিক শিক্ষা সার্বজনীন, কিন্তু উচ্চ শিক্ষা সক্ষমতা অনুযায়ি< মানে একজন শিক্ষার্থী উচ্চ শিক্ষায় অংশ নেবার বুদ্ধিবৃত্তিক ও মেধাগত সক্ষমতা রাখবেন। এবং এটাই গুরুত্বপূর্ণঃ আমাদের শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষায় মেধার প্রমাণ দিয়ে ভর্তি হচ্ছেন। একবার এই পরাকাষ্ঠা পার হওয়ার পর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সবিস্তারে রাষ্ট্র সকল শিক্ষার্থীকে সমান অভিগম্যতা দিতে বাধ্য। কাজেই আমার ক্লাসের ৯৯ জন শহরে থাকে, ল্যাপ্টপ চালায়, ওয়াইফাই সংযোগ রাখে, তাঁর ক্লাসে সমস্যা হবে না; কিন্তু ১ জন-ও যদি অর্থনৈতিক, শ্রেণীগত বা সামাজিক কারণে শিক্ষায় অংশগ্রহণের সমান সুযোগ না পায়, তাহলে তাঁর শিক্ষার অধিকার এখানে লংঘিত হচ্ছে।
 
২। বাংলাদেশের শিক্ষার ক্ষেত্রে বৈষম্য কি আগে ছিল, না করোনার কারণেই হচ্ছে?
বাংলাদেশ এমনিতেই শিক্ষার ক্ষেত্রে নানা রকম বৈষম্য আছে, যেমন আমাদের বিভিন্ন ধারার শিক্ষার কারিকুলাম এবং মানের তারতম্য আছে। সরকারি, মাদ্রাসা বোর্ড এবং ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা আলাদা আলাদা সিলেবাস পড়ে বড় হচ্ছে, ফলে তারা যখন উচ্চ শিক্ষায় প্রবেশ করে, তখন একেকজন একেকরকম অবস্থানে থাকে। এই পার্থক্য থেকে বৈষম্য তৈরি হচ্ছে, কারণ একটি দেশের সকল শিক্ষার্থী এক মানের শিক্ষা লাভের অধিকার রাখে।
আবার সরকারী শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠান আর বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার মান নিএ তুলনা করা যেতে পারে। আপনার সন্তান কোথায় পড়বে তা অনেক খাই নর্ভর করে আপনার অর্থনোইতিক সক্ষমতা এবং সামাজিক অবস্থানের ওপর। আবার দেশের এলাকার ওপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান নির্ভর করে, যেমন সিলেট বা চট্টগ্রামের স্কুল কলেজের সাথে সাতখীরা, হাতিয়া এসব প্রান্তিক স্থানের তুলনা হবে না।
এর পাশাপাশি আছে আমাদের শিক্ষাদানের পদ্ধতি, যেখানে কোচিং একটি বড় ভূমিকা রাখে। এখানেও অর্থনৈতিক সক্ষমতার প্রশ্ন আসে।
উচ্চ শিক্ষার ক্ষেত্রে আমরা দেখি, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচের মধ্যে বিশাল পার্থক্য আছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান সংকুলান হয় না। ফলে এমন হয়ে থাকে যে কোন একজন শিক্কার্থী যে স্থান সংকটের কারণে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান পেল না, কিন্তু বেসরকারিতে পরার স্বচ্ছলতা তার নেই। আবার, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং গ্র্যাজুয়েটরা চাকুরির ক্ষেত্রে নানা রকম প্রতিবন্ধকতার শিকার হন। মাদ্রাসা বোর্ডের শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগে ভর্তির সুযোগ পান না, অথচ মাদ্রাসা আমাদের দেশের স্বীকৃত মাধ্যম।
এ বৈষম্য যেমন বেড়েছে, তেমনি বলা ভাল যে বৈষম্যের নতুন নতুন মাত্রা যুক্ত হয়েছে।
যেমন, অনেকে টিভি এবং অনলাইনের মাধ্যমে পড়ালেখার কথা বলছেন। এমন সিদ্ধান্তের presupposition হল টিভি এবং অনলাইনে সবার অ্যাক্সেস আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের সিংহ ভাগ শিক্ষার্থীরা যে আর্থসামাজিক অবস্থানে আছে, এটা ধরে নেয়া কি যৌক্তিক কিনা যে তাদের সবার বাসায় টিভি আছে? আবার টিভি যদি থাকেও, যখন টিভিতে আমার ঘরে আমার স্কুল কার্যক্রমটি সম্প্রচার হচ্ছে, তখন কি ইলেক্ট্রিসিটি আছে? যদি না থাকে, তাহলে কি হবে? আমাদের গ্রামে এমন হয়ে থাকে যে কোন একটি বাড়িতে টিভি থাকে আর অনেক বাড়ির মানুষ ঐ বাড়িতে টিভি দেখতে যান। এখন এলাকার সবার শিক্ষা নিশ্চিত করার জন্য যদি ঐ বাড়ি আদের টিভি উন্মুক্ত করে দেন, তার বিদ্যুতের বিল নিয়ে তখন প্রশ্ন উঠবে।
দ্বিতীয়ত, যে রুটিন করা হয়েছে, সেখানে জাতীয় শিক্ষাক্রমের ক্লাস গুরুত্ব পেয়েছে। মাদ্রাসা বোর্ডের জন্য কতটা সময় ওখানে দেয়া হচ্ছে? মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা কি সমান সময় পাচ্ছেন তাদের পাঠ্যক্রম সম্পন্ন করার? মাদ্রাসা বোর্ড যেহেতু অনুমোদিত বোর্ড, এক্ষেত্রে কোনভাবেই এটিকেআলাদা বা কম সুযোগসুবিধা দেয়া যাবে না। একই কথা খাটে টেকনিকাল ও ভোকাশনাল শিক্ষার ক্ষেত্রে।
টিভির পরে আসে অনলাইন। অনলাইনে ভিডিও দেখার জন্য আপনার ভারি ডাটা প্যাকেজ প্রয়োজন। এত দাম দিয়ে কতজন ডাটা কিনতে পারবে?
এখানে জেন্ডারের কথা বলতে হবে। আমাদের গ্রামে অনেক পরিবারে একটা মাত্র মোবাইল থাকে, এবং তার নিয়ন্ত্রন থাকে পুরুষদের হাতে। কাজেই পরিবারের ঐ পুরুষ যদি সিদ্ধান্ত নেন যে মোবাইলিটি তার প্রয়োজন, বা টিভি কেবল তিনি দেখবেন, তাহলে মেয়ে শিক্ষার্থীরা টিভি আর মোবাইল থাকা সত্ত্বেও পরাশোনা করতে পারবেন না।
দ্বিতীয়ত, আমাদের দেশে সর্বত্র নেট কানেকশন ভালো না। এমন অনেক সময় হয় যে ভালো সংযোগের জন্য আপনাকে খোলা জায়গায় যেতে হচ্ছে বা বাড়ির নির্দিষ্ট কোণে যেতে হচ্ছে। আমি এমন খবর পেয়েছি যে ক্লাসের জন্য শিক্ষার্থীরা ধান খেত বা গাছের তলায় গিয়ে দাঁড়াচ্ছে। আবার মেয়েরা এমন ভাবে ক্লাস করতে পারছে না কারণ বাংলাদেশে আমরা নারিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারিনি। এরকম অবস্থানে থেকে লেকচারে কতটা মনোযোগ দেয়া যায়?
অনেক শিশু স্কুল থেকে দেয়া খাতা পত্র দিয়ে পড়াশোনা চালায়। উপক্রণ ছাড়া তারা এখন পড়তে পারছে না।
বিশেষ করে, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এই বৈষম্য মারাত্মকভাবে ফুটে উঠেছে।
এর ফলে যেটা হচ্ছে, শিক্ষার্থীরা নতুন করে বুঝতে পারছে, তারা সবাই সমান নয়য়। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী, যারা হয়ত তাদের অর্থনোইতিক সংগ্রাম কারও কছে এতদিন প্রকাশ করেনি, তাদের কথা অন্যরা জেনে যাচ্ছে। এই সামাজিক হীনম্মন্যতা তাদের মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করছে। অনেক শিক্ষার্থী নিজেরা টিউশন করিয়ে বা পার্ট টাইম কাজ করে পড়ালেখা করে। তাদের সেই উপার্জন বন্ধ। অনেক স্বচ্ছল ব্যবসায়ী এখন মন্দায় আছেন, ফলে স্বছল পরিবারের শিক্ষার্থীরাও , বিশেষ করে যারা অন্য শহরে পড়তে যায়, তারা পড়ালেখা চালাতে পারছে না।
এখন অনেকেই অনলাইনে নানারকম কোর্স করে নিজেদের দক্ষতা বাড়ানর চেষ্টা করছে। এখন আপনার ল্যাপ্টপ বা পিসি না থাকলে, এবং অনেক ক্ষেত্রে ক্রেডিট কার্ড না থাকলে এসব কোর্স আপনার নাগালের বাইরে। কাজেই শিক্ষার্থীয়া দেখছ, আমার বন্ধু এত কিছু করছে, কিন্তু আমি পারছি না।
 
৩। নারী শিক্ষার্থীরা আলাদা সমস্যার সম্মুখীন হতে পারেন
যেহেতু স্কুল কলেজ বন্ধ, নারী শিক্ষার্থীদের এখন ঘরের কাজে বেশি নিযুক্ত করা হচ্ছে। কিশোরীদের নিজের মত বাসায় বসে পরাশোনার সুযোগ কম, তাদের গৃহস্থালি কাজ করতে বলা হচ্ছে, কিন্তু তার ভাই হয়ত বাড়ির কাজ করছে না, নিজের মত বই পড়তে বা অন্য কিছু করতে পারছে।
অনেক নারী শিক্ষার্থী নিজের প্রচেষ্টায় পরিবারের অমতে পড়াশোনা চালিয়ে যান, তারা এখন ঝুঁকির মুখে আছেন। অ্যায় কমে গেছে এবং ব্যায় বেড়ে গেছে। অনলাইন বা টিভিতে পড়ার ব্যা অবশ্যই বেশি হচ্ছে। কাজেই অনেক পরিবারে সিধান্ত নেয়া হবে যে সব সন্তানকে স্কুলে রাখা যাবে না, কাজে ঢুকিয়ে দেয়া হবে। অনেকেই বলবে মেয়ের পরার পেছনে এত খরচ করব না, যৌতুকের টাকা কি এসবের পেছনে চলে যাবে নাকি?
কাজের পড়া বন্ধ করা চাপ সবার আগে আসবে মেয়ে শিশুদের ওপরে। এর ফলে বাল্যবিবাহের পরিমাণ বেড়ে যাবে, সত্যি কথা বলতে ইতোমধ্যে বাল্যবিবাহ বেড়ে গেছে বলে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে।
 
অতঃপর ঃ
আমাদের সুসমন্বিত পদক্ষেপ দরকার। দুঃখের বিষয়, আমাদের জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাত বরাবর-ই অবহেলিত। ২০২০-২১ এর বাজেটেও সার্বিক জিডিপির বিপরীতে শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ খুব কম, মাত্র ১১.৬৯% অথচ ২০১০-১১ তে এটি ছিল ১৪%। এর মধ্যে আবার জাতীয় বোর্ড, টেকনিকাল শিক্ষা এবং মাদ্রাসা বোর্ডের খাতে বিশাল অঙ্কের পার্থক্য আছে। এটা বৈষম্য প্রলম্বিত করবে। রাষ্ট্রকে ইন্টারনেট সুবিধা সহজলভ্য এবং সংযোগের মান নিয়ে কাজ করতে হবে

4 thoughts on “করোনা, অনলাইন শিক্ষা এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য”

Leave a Comment

Your email address will not be published.