ঔপনিবেশবাদ (colonialism), ঔপনিবেশিকতা (coloniality), আধুনিকতা (modernity) এবং বাঙ্গালির হীনম্মন্যতা – ১প্রতিপাদ্যঃ

আমাদের দেশের বিদ্যালয় মহাবিদ্যালয় পর্যায়ে ইতিহাসের যে পাঠ দেয়া হয়, তাতে ঘটনা, তারিখ, নামের প্রাধান্য বেশি, কিন্তু ঐতিহাসিক বিভিন্ন ঘটনার যে সামাজিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ, তা খুব বেশি গুরুত্ব পায় না। এটা আমি দাবি করতে পারি, কারণ আমি ইতিহাস পড়েছি বোর্ড কারিকুলামে। অতপর বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গিয়ে বিভাগভেদে এসব বিষয়ের আলাপ আরও কমে যায়। আর আমাদের কারিকুলামের দৈন্যদশা তো আছেই। বাংলাদেশের কয়টা আইন বিভাগে উপনিবেশবাদ একটি মৌলিক পাঠ্যবিষয়? হাতে গোণা। এর ফলে যা হয়েছে, উপনিবেশবাদ সম্পর্কে আমাদের সমাজে অনেক মানুষের, বিশেষ করে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রাপ্ত মানুষের ধারণা খুব অস্পষ্ট, ধোঁয়াশাময় এবং অনেক ক্ষেত্রে ভুল। যেমন ধরা যাক, আমরা ইতিহাস বা সমাজবিজ্ঞান বইয়ে বৃটিশ শাসনামল পড়েছি, দ্বৈত শাসন পড়েছি, ফকির সন্যাসী বিদ্রোহ পড়েছি, পাকিস্তান আমলের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ভাষা আন্দোলন, ৬ দফা , ৭০ এর নির্বাচনে পিপিপির ভরাডুবি এসব পড়েছি। কিন্তু এর প্রতিটি ঘটনার পেছনে কীভাবে রেসিজম, গভের্ন্মেন্টালিটি, দমন, সহিংসতা, আধিপত্য (hegemony) কাজ করেছে তা আমরা অভাবে পড়িন্নি। আমরা সতীদাহ প্রথা বিমোচন নিয়ে পড়ি, কিন্তু এটা কিভাবে একাধারে ঔপনিবেশিক এবং দেশি দমন পীড়ন ছিল তা পড়ি না।প্রশ্ন উঠবে, স্কুল কলেজের কাঁচা বয়সে এত জটিল বিশ্লেষণের দরকার আছে কি? উত্তর হল, হ্যাঁ আছে। সেই বয়সের উপযোগী করে বিশ্লেশণ রাখা যায়, কিন্তু বিশ্লেষণ থাকাটা খুব জরুরি। কেন? কারণ এই বিশ্লেষণ না থাকার ফলে ইতিহাস আমাদের কাছে হয়ে গেছে দিন তারিখ মুখস্তর বিষয়, ক্লোনিয়ালিজম হয়ে গেছে আঁতলামির বিষয়। এর সবচেয়ে বড় কুফল হয়েছে আমাদের বাঙ্গালিদের আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব।বাঙালি বললাম, বাংলাদশি না, কারণ আমাদের আদিবাসীদের আত্মপরিচয়ের দ্বন্দ্ব আমাদের চাইতে খুব কম, ইনফ্যাক্ট নেই বললেই চলে। কীভাবে উপনিবেশবাদ আমাদের মন মানসিকতাকে গেঁড়ে রেখেছে, তা বাঙ্গালিদের দেখলে ভালো বোঝা যাবে।উদাহরণ দিচ্ছি। আমরা মনে করি, উপনিবেশবাদ শেষ হয়েক্সছ্ব ৭০ ওএর দশকে। এখন নব্য-উপনিওবেশবাদ চলছে, সেতাও আমরা মূলত মার্কিন মুলুকের আগ্রাসন দিয়ে আর ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ভূরাজনীতি দিয়ে সীমিত রাখি। আমরা অনেকেই হয়ত পড়ার সুযপগ পাইনা যে উপনিবেশবাদের পাশাপাশি উপনিবেশিকতা বলে একটা কথা আছে, যার অর্থ হল উপনিবেশের শাসন শেষ হবার পরও কীভাবে উপনিবেশের প্রভাব থেকে যায়, সেই প্রভাব দৈনন্দিন জীবন যাপনে, প্রাতহিক বাস্তবতায় প্রয়োগ হয়, এবং সেই প্রয়োগটা করে স্বাধীন হওয়া দেশের মানুষ নিজেরাই। উপনিবেশিকতা রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে ঢুকে থাকে যে আমরা সেটা ধরতে পারি না। যেমন, আমাদের বেশিরভাগ আইন বৃটিশ এবং পাকিস্তান আমলের। এসব আইনের উদ্দেশ্য ছিল কলনিয়াল শাসককে সাহায্য করা। স্বাধীন দেশে এই আইন যখন প্রয়োগ হবে, তখন তাঁর ফলাফল হবে নাগরিকের স্বাধীনতার সঙ্কোচন। যেমন আমাদেফ্র ১৯২৩ এর অফিশিয়াল সিক্রেসি আইন, যেটা দিয়ে খুব সহজেই সাংবাদিকদের কাবু করা যেতে পারে অথবা দণ্ডবিধি ১৮৬০, যেখানে এখনও ধর্ষণের ধারায় প্রাচীন ব্যাখ্যা বা দেশদ্রোহিতার মত অপরাধের শাসকসুলভ ধারা আছে, একুজিশন ক্ষমতা দেয়া ভূমি আইন আছে, বা ১৮৯৮ এর ফৌজদারি কার্যবিধি যেখানে পুলিশের ক্ষমতার অপব্যবহারের সুযোগ আছে। সেই সাথে আছে পাকিস্তানের কুখ্যাত শত্রু সম্পত্তি যা এখন অর্পিত সম্পত্তি আইন নামে চলছে। এসব আইন যেহেতু ঔপনিবেশিক, তাই স্বাধীন দেশের বিসিএস অফিসারেরা এর প্রয়োগ করতে গেলে সেই প্রয়োগ আপনি থেকেই ঔপনিবেশিক চরিত্র ধারণ করে। কিন্তু আমরা যেহেতু কলনিয়ালিটিতে আক্রান্ত, এসব আমাদের বেশিরভাগ নীতিনির্ধারকদের চোখে পড়ে না, পড়লেও তা সংশোধন আমাদের সর্বাগ্রাধিকার ধরা হয় না।এই কলোনিয়ালিটির আরেকটা মারাত্মক ফলাফল হল, পাকিস্তান আমলকে ঠিকিভাবে চরিত্রায়ণ করতে না পারা। পাকিস্তান কেবল আমাদের শোষণ করে নি, পাকিস্তান আমাদের আরেকটা আধা-উপনিবেশ (কোয়াসাই-কোলনিয়াল) বানিয়ে রেখেছিল। উপনিবেশের যেসব লক্ষণ, কাঁচামাল বা রিসোর্স লুট করা (আমাদের পাট দিয়ে ইসলামাবাদ সমৃদ্ধ করা), “নেটিভদের” অকর্মা, অযোগ্য, অনুন্নত ভাবা (বাঙালি অফিসারদের না নেয়া, নিলেও প্রম্মোশন আটকে রাখা), নেটিভদের জ্ঞানকে অপজ্ঞান ধরা (বাংলা ভাষা-সাহিত্য নিষেধ করা), নেটিভদের স্বকীয়তাকে অসীকার করা এসব বৃটিশ যেমন করেছে পাকিস্তানও করেছে। কিনতু পাকিস্তানের এই ঔপিনিবেশিক চরিত্র সেভাবে পাঠ্যবইয়ে উঠে আসে নি। ফলে এখনও প্রচুর বাঙালি মনে করে, মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে পাকিস্তান আমাদের সরকার গঠন করতে দেয় নি বলে, শোষণ করেছে বলে।

Leave a Comment

Your email address will not be published.