আত্মহত্যা, পরিবার, ও সভ্য দেশের আইন

১৮ জানুয়ারি, ২০২০

আমার এক প্রাক্তন শিক্ষার্থী প্রাণঘাতী হয়েছেন। খবরটা পাওয়া অবধি আঘাত পেয়েছি, কেঁদেছি। সেই শিক্ষার্থী বেশ চৌকস ছিলেন। সমাজের অসঙ্গতিগুলো নিয়ে প্রায়ই কথা বলতেন। তার নিজের জীবনের অসঙ্গতিগুলো চেপে রাখতেন, কিন্তু তার বিভিন্ন কথাবার্তায় বোঝা যেত তিনি যুদ্ধ করছেন। তার সাথে শেষ যেবার মুখোমুখি কথা হল, দেখেছিলাম তিনি শুকিয়ে অর্ধেক হয়েছেন। তার কথায় বুঝেছিলাম অ্যানোরেক্সিয়াতে ভুগছিলেন। বলেছিলাম সাহায্য নিতে। কিন্তু ততদিনে তিনি আর আমার সরাসরি শিক্ষার্থী ছিলেন না, তাই একটা পর্যায়ের পর সৌজন্যের খাতিরে আমাকে দূরত্ব রাখতে হত।

শুনলাম, প্রাণঘাতী হওয়ার ঠিক আগে দিয়ে নাকি তার সাথে পরিবারের কিছু কাছের মানুষের কথা কাটাকাটি , মন কষাকষি হয়েছে। আমি জানি, বেশিরভাগ মানুষ শুনেই বলবেন, এই? এটুকুর জন্য তাকে সুইসাইড করতে হবে? আজকালকার ছেলেমেয়েরা ইত্যাদি ইত্যাদি…

হ্যাঁ, আজকালের ছেলেমেয়ে। এবং আজকালের বাবামা। সব দোষ নন্দ ঘোষের মত আমরা একপেশে ভাবতে খুব ভালোবাসি। ছেলেমেয়েরা এমন কিছু করলে প্রথমেই যে কথাটা শুনি তা হল, এরা একবার-ও ভাবল না মাবাবার কেমন লাগবে? সে তো চলে গেল, কিন্তু মাবাবাকে শেষ করে দিয়ে গেল।

কতটা স্বার্থান্ধ এই কথাটা, একটু ভেবে দেখুন তো। একজন মানুষ চাপের কোন প্রান্তে গেলে নিজেকে শেষ করে দিতে চায় সে বিষয়ে অন্যরা ভাবেও না, এবং আমাদের পাবলিক ন্যারেটিভে এ কথাগুলো অভাবে আসে না। তাও তো আজকাল সুইসাইডাল মানুষদের যত্নের কথা বলা হচ্ছে, ডিপ্রেশনের কথা মানুষ শুনছে এবং বোঝার চেষ্টা করছে। কিন্তু দিল্লি দূরস্ত।

এ তো গেল সমাজের লোকের কথা। কিন্তু সমাজের ব্যবস্থা কি ঠিক আছে? এই যে আমার শিক্ষার্থী চলে গেলেন, যেই মাত্র সবাই জানবে যে তিনি প্রাণঘাতী এবং তা মাবাবার সাথে ঝগরার মত তুচ্ছ আবেগিক কারণে, তৎক্ষণাৎ সব হইচই থেমে যাবে। পুলিশ ডাইরিতে ছোট্ট করে লিখবে আত্মহত্যা, হয়ত ডেথ সার্টিফিকেটে ডাক্তারবাবু চিকিতসাশাস্ত্রের একটি খটমট বিষয় লিখবেন, বাসায় শোক হবে, ব্যস।

কিন্তু সভ্য দেশ হলে কী হত? হ্যাঁ, আমি জেনে শুনেই ‘সভ্য’ লিখছি। আমি নিজেই ক্লাসরুমে কলোনিয়াল হ্যাঙ্গভার নিয়ে কথা বলি, ২০০ এবং তারপর ২৩ বছরের ঔপনিবেহসিক শাসন আমাদের কী ক্ষতি করেছে তা বলতে বলতে ফেনা অস্থির হয়ে যাই, আন্তর্জাতিক আইনের ক্লাসিক সমালোচনা করি, যে কীভাবে সাদা চামড়ার দেশগুল নিজেদের ‘সভ্য’ দেশ বলে ভাবত। সেই আমি আজ বলছি, ১৯৩০ এ সভ্য না হলেও ঐ দেশগুলর আজকের কিছু কিছু কাজ অবশ্যই সাধুবাদ দেয়ার মত।

যেমন, অসব দেশে এমন সুইসাইড হলে পুলিশ অবশ্যই তদন্ত করবে। হোক না মাবাবার সাথে মন কষাকষি। সেটাও মুখের কথা মানা হবে না। কথা বলে, রিপোর্ট নেয়া হবে যে ঠিক কী হয়েছিল, কী নিয়ে রাগারাগি, কেমনতর ঝগরা যে একজন প্রানঘাতী হল? এর আগে তার মানসিক অবস্থা কেমন ছিল? সেটা কি অন্যেরা জানত? না জানলে কেন জানত না? অর্থাৎ একজন প্রানঘাতী মানুষ ঐ সমাজে হথাত করে হারিয়ে যাবেন না। তাঁকে বোঝার চেষ্টা করা হবে, যেন তার অবস্থায় থাকা আরেকজনকে সাহায্য করা যায়।

ভুল বুঝবেন না। এসব তথ্য মামলা করার জন্য, বা মাবাবাকে কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাওার জন্য না। ( যদিও মাবাবা হিসেবে কেউ যদি চরম অবহেলার পরিচয় দেন তার জন্এয ব্যবস্থা আছে, যা বাংলাদেশে কাজ করে না)। এ তথ্যগুলো ডাটা হিসেবে অমূল্য। এ থেকে বোঝা যায় সমাজের বিভিন্ন বয়সের মানুষ কীভাবে চিন্তা করছে, পরিবারে কি কি ধরণের সমস্যা দেখা দিচ্ছে, কীভাবে কথা বলা আমার পরিবারের কোন সদস্যের জন্য ভাল বা খারাপ। ‘সভ্য’ দেশগুলোতে এসব ডাটা সংগ্রহ করে, বিশ্লেষণ করে, তার ভিত্তিতে সামাজিক পলিসি নির্মিত হয়। এমনি এমনি ওসব দেশে পারিবারিক নির্যাতন, নারী নির্যাতন, মানসিক স্বাস্থ্য, শিশু নির্যাতন এসব বিষয়ে সচেতনতা তৈরি হয়নি। এগুলো দীর্ঘদিনের গবেষণার ফসল।

ঐ দেশগুলো আমাদের সম্পদ চুষে নিয়ে গিয়েছে, কিন্তু নিজের দেশের মানুষগুলোকে রক্ষা করার চেষ্টা করেছে। আমরা অদের খেদিয়ে ভেবেছি উদ্ধার হল। নিজেদের মানুষগুলোকে জে যত্ন করতে হয়, তা ভাবার ফুরসত কই?

কিন্তু বাংলাদেশে গবেষণা হবে না। পরিবারকে বোঝানোর চেষ্এটা করা হবে না। বাংলাদেশে এই মানুষগুলো কেবল একটা ডাইরি এন্ট্রি হয়ে হারিয়ে যাবেন। আর আমরা, নিঃশ্বাস নিতে থাকা অর্ধ মৃত মানুষগুলো এ ভেবে রাজা উজির উদ্ধার করব যে, ছেলেমেয়েরা সব নষ্ট হয়ে গেছে। আগেই ভালো ছিলাম।

নষ্ট যে হয়েছে, জানেন কীভাবে? সেটাও তো ডাটা, নাকি?

4 thoughts on “আত্মহত্যা, পরিবার, ও সভ্য দেশের আইন”

Leave a Comment

Your email address will not be published.